করোনা ভাইরাসের টিকা সম্পর্কে তথ্য জানি, সচেতন হই এবং করোনার টিকা গ্রহণ করি। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক)

করোনা ভাইরাসের টিকা সম্পর্কে তথ্য জানি, সচেতন হই এবং করোনার টিকা গ্রহণ করি। (তথ্যসূত্র: প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক)

করোনাভাইরাসের টিকা নেওয়ার পর মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি (করোনা প্রতিরোধক্ষমতা) তৈরি হচ্ছে। দেশে অক্সফোর্ড–অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা গ্রহণকারীদের ৯৮ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে টিকা নেওয়ার পরও যে কেউ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রে তাঁদের ঝুঁকি টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় কম। আক্রান্ত ব্যক্তিদের বিভিন্ন জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি কমাচ্ছে টিকা।

করোনাভাইরাসের টিকা নিয়ে দুটি পৃথক গবেষণায় এসব তথ্য পাওয়া গেছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ওপর টিকার প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। গত রোববার রাতে ওই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন—এমন রোগীদের তুলনায় টিকা না নেওয়া রোগীদের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতা বেশি। টিকা না নেওয়া ব্যক্তিদের হাসপাতালে ভর্তির হার এবং মৃত্যুঝুঁকিও বেশি।

অন্যদিকে টিকা নেওয়ার পর অ্যান্টিবডি কেমন তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে একটি গবেষণা করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। গবেষণাটির ফলাফল গতকাল সোমবার প্রকাশ করা হয়। যাঁরা আগেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাঁদের শরীরে তুলনামূলক বেশি অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। যে ২ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি, তাঁরা জটিল রোগে আক্রান্ত, অনেক বয়স্ক ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতা অনেক কম।

দেশে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্তের খবর জানানো হয়। চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয় গণটিকা দান। মাঝে কিছুদিন টিকার নিবন্ধন বন্ধ থাকার পর এখন আবার টিকাদান শুরু হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে টিকাদানে বাংলাদেশ শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। কোভিড–১৯ টাস্কফোর্সের সর্বশেষ তথ্য এটি। তবে তাদের পর্যবেক্ষণে মালদ্বীপের তথ্য উল্লেখ নেই।

ঝুঁকি কমাচ্ছে টিকা

গত মে ও জুন মাসে টিকার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করে আইইডিসিআর। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, দৈবচয়নের ভিত্তিতে করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তিদের জাতীয় তালিকা থেকে গবেষণার জন্য নমুনা বাছাই করা হয়। এর মধ্যে ৫৯২ জন আক্রান্ত রোগী ছিলেন, যাঁরা করোনার টিকার একটি ডোজও নেননি। আর ৩০৬ জন ছিলেন, যাঁরা পূর্ণ ডোজ টিকা নেওয়ার অন্তত ১৪ দিন পর করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিদের রোগ শনাক্তের কমপক্ষে ১৪ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর তাঁদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন কিন্তু টিকা নেননি, এমন ব্যক্তিদের ৩ শতাংশের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। আর পূর্ণ ডোজ টিকা নেওয়ার পর আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে আইসিইউতে ভর্তি হয়েছিলেন ১ শতাংশের কম। টিকা না নেওয়া রোগীদের ৩ শতাংশ মৃত্যুবরণ করেছেন, আর টিকা নেওয়া রোগীদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছিল শূন্য দশমিক ৩ শতাংশের।

গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা না নেওয়া আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত জটিলতার হার ছিল ১১ শতাংশ। দুই ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৪ শতাংশ।

করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁদের উপসর্গ জটিল, তাঁদেরই হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। আইইডিসিআরের গবেষণায় দেখা গেছে, টিকা না নেওয়া রোগীদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তির হার ২৩ শতাংশ। আর দুই ডোজ টিকা নিয়ে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ৭ শতাংশ।

করোনায় আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে যাঁরা অন্যান্য অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত এবং টিকা নেননি, তাঁদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তির হার ৩২ শতাংশ। আর দুই ডোজ টিকা নেওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই হার ছিল ১০ শতাংশ।

টিকা গ্রহণকারী ৯৮ শতাংশের শরীরে অ্যান্টিবডি

‘হেমাটোলজিক্যাল প্যারামিটার্স অ্যান্ড অ্যান্টিবডি টাইটার আফটার ভ্যাকসিনেশন অ্যাগেইনস্ট সার্স-কোভিড-২’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল গতকাল প্রকাশ করেছে বিএসএমএমইউ। বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য ও গবেষক দলের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ জানান, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভাবিত ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের তৈরি অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা গ্রহণকারী ২০৯ জনের ওপর গবেষণাটি চালানো হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে টিকা নিয়েছেন।

উপাচার্য শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, এই গবেষণায় দেশের জনগণের ওপর টিকা প্রয়োগের পর কার্যকর অ্যান্টিবডি তৈরির প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে সময়ের সঙ্গে অ্যান্টিবডির উপস্থিতির পরিবর্তন হয়। অন্যান্য টিকার অ্যান্টিবডি তৈরির কার্যক্ষমতা পর্যালোচনার জন্য আরও গবেষণা করা হবে। টিকার প্রথম ডোজ নেওয়ার তিন চার মাস পরে দ্বিতীয় ডোজ নিলে কী পরিমাণ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়, সেই বিষয়েও গবেষণা করা হবে।

উপাচার্য বলেন, ‘কোনো ধরনের আতঙ্ক নয়, টিকা নিলে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুঝুঁকি একেবারেই কম। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অবশ্যই টিকা নিতে হবে।’

গবেষণায় বলা হয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ পুরুষ এবং অর্ধেকের বেশি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের সঙ্গে জড়িত। তাঁদের মধ্যে ৩১ শতাংশের আগে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। অর্ধেকের বেশি অংশগ্রহণকারী আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানিসহ অন্যান্য রোগে ভুগছিলেন। তবে এসব রোগ থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই টিকা গ্রহণের পর অ্যান্টিবডি তৈরিতে কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি। ৪২ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর টিকা গ্রহণের পর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে সামান্য জ্বরসহ মৃদু উপসর্গ ছিল। রক্ত জমাট বাঁধা বা এ রকম অন্য কোনো জটিল পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া গবেষণাকালীন দেখা যায়নি। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সঙ্গে অ্যান্টিবডির উপস্থিতির কোনো সম্পর্কও পাওয়া যায়নি। বিএসএমএমইউর সহ–উপাচার্য (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক মো. জাহিদ হোসেন, সহ–উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক এ কে এম মোশাররফ হোসেন, হেমাটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. সালাহউদ্দীন শাহ সহগবেষক হিসেবে এই গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *